ভোরের কুয়াশায় যখন চারপাশে ঘুম ঘুম ভাব, তখনই জেগে ওঠেন মনু মিয়া। ঘড়ির কাঁটা তখনো ভোর ৪টা ছুঁয়েও পৌঁছায়নি। পুরোনো একটি শার্ট গায়ে চাপিয়ে নদীর দিকে পা বাড়ান তিনি—পালকির চরের দিকে। হাতে ছোট্ট একটি জাল, পেছনে কয়েকজন যুবক; সবার লক্ষ্য একটাই—চিংড়ি পোনা ধরা।
মনু মিয়া বয়সে পঞ্চাশের ঘরে। পেশা বলতে এখন এইটুকুই—চিংড়ি পোনা ধরা আর বিক্রি করা। দিনে আয় হয় গড়ে ২০০-৩০০ টাকা। পরিবারে স্ত্রী, তিন সন্তান আর এক বৃদ্ধা মা। কারওই উপার্জনের পথ নেই। একসময় নৌকায় করে বড়শি ফেলে মাছ ধরতেন। তখন নদীতে মাছ ছিল, ছিল চাহিদা, ছিল সম্মানও। কিন্তু সময় বদলেছে। নদীর বুক শুকিয়ে গেছে, বড় মাছ আর তেমন ওঠে না। তাই পেটের দায়ে মনু মিয়াও এখন পোনার জালে।
“আমরা জানি, এতে নদীর ক্ষতি হয়। কিন্তু পেট তো ক্ষতি মানে না ভাই। সরকার তো দেখি শুধু নিষেধ করে, কিন্তু খাইতে কী দিবে—এইডার তো কোনো উত্তর নাই।”—বলে নিজের মনেই হাসেন মনু মিয়া।
চিংড়ি পোনা আহরণের এই কাজটি পরিবেশের জন্য ভয়াবহ ক্ষতিকর, এটা মনু মিয়ার অজানা নয়। জাল টানার পর যে হাজারো পোনা ধরা পড়ে, তার বেশিরভাগই ফেলে দিতে হয়। “চিংড়ি ছাড়া বাকি পোনাগুলা তো কেউ নেয় না, নষ্ট হয়ে যায় সব। কিন্তু এই জাল ছাড়া পয়সাও পাই না,”– বলেন তিনি।
এইভাবেই প্রতিদিন দেশের শত শত নদীতে চলছে পোনার অনিয়ন্ত্রিত সংগ্রহ। স্থানীয় প্রশাসনের মাঝে মাঝে অভিযান হয় বটে, কিন্তু তা অনেক সময়ই হয় লোক দেখানো। আবার কখনও বড় মাছ ব্যবসায়ীর ছত্রছায়ায় এসব কার্যক্রম নির্বিঘ্নেই চলে। মাঝখানে ক্ষতিগ্রস্ত হয় নদী, ক্ষতিগ্রস্ত হয় জীববৈচিত্র্য।
মনু মিয়া শুধু একজন নাম নয়; তিনি এই সমাজের এক প্রতিচ্ছবি। তার মতো আরও হাজারো মানুষ জীবিকার অভাবে বাধ্য হয়ে জড়িয়ে পড়েছেন এই কাজের সঙ্গে। কেউ হয়তো জানেন না, কারও মাথায় সময় হয় না ভাবার। শুধু একটা চিন্তা ঘুরে ফিরে আসে—“কাল ছেলেটার জন্য দুধ আনতে পারব তো?”
তবে মনু মিয়ারও ইচ্ছা আছে। নদীর ক্ষতি না করে কিছু করতে চান তিনি। “কেউ যদি একটা বিকল্প কাজ শেখাইতো, আমি ছাইড়া দিতাম এই কাম। আমি কাঠের কাজ শিখছিলাম ছোটবেলায়। কেউ যদি একটা সাপোর্ট দিত…”, কথার মাঝেই হারিয়ে যান অতীতে।
এই বাস্তবতাই দেখিয়ে দেয়, শুধু নিষেধাজ্ঞা বা আইন দিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না। দরকার বিকল্প ব্যবস্থা, দরকার প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্রঋণ, মৎস্যচাষের উন্নত পদ্ধতি শেখানো—যা বাস্তবে কাজে লাগবে। সরকার, বেসরকারি সংস্থা, স্থানীয় প্রশাসন—সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শুধু নদী বাঁচলেই হবে না, নদীঘেঁষা মানুষগুলোকেও বাঁচাতে হবে।
চিংড়ি পোনা আহরণের নিষ্ঠুরতা যতটা না মনু মিয়ার পছন্দ, তার চেয়েও বেশি তা জীবনের অনিবার্যতা। আজ তার জীবন নদীর পাড়ে, জালে বাঁধা। কিন্তু যদি সুযোগ মেলে, যদি বিকল্প আসে, তবে হয়তো মনু মিয়ারা আবার ফিরে যাবেন নদীকে ভালোবেসে, নদীকে বাঁচাতে।
কেননা, নদী শুধু পানির ধারা নয়। এটি জীবনধারা। আর মনু মিয়ার মতো মানুষদের গল্পেই তা প্রতিফলিত হয়—যেখানে চিংড়ির পেছনে ছুটে চলে জীবন, কিন্তু মন পড়ে থাকে জীবনের গভীর স্রোতে।






