img-converter

স্ট্রোকের প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ: দ্রুত চিকিৎসায় বাঁচতে পারে জীবন

— লেখক: ডা. সোমেন চৌধুরী
শেয়ার: Facebook Twitter WhatsApp

স্ট্রোক এমন একটি জরুরি স্বাস্থ্যসমস্যা, যেখানে সময়মতো সঠিক চিকিৎসা একজন মানুষের জীবন বাঁচাতে এবং দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতার ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু বাস্তবে স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দেওয়ার পরও অনেক সময় রোগী বা পরিবারের সদস্যরা বুঝতে পারেন না কী করা উচিত। কেউ অপেক্ষা করেন লক্ষণ কমে যাওয়ার জন্য, কেউ আবার বাড়িতে প্রাথমিক চিকিৎসার চেষ্টা করেন। অথচ স্ট্রোকের ক্ষেত্রে এমন বিলম্ব বিপজ্জনক হতে পারে।

 

চিকিৎসাবিজ্ঞানে একটি বহুল প্রচলিত কথা হলো—“Time is Brain”। অর্থাৎ, প্রতিটি মুহূর্তের বিলম্বে মস্তিষ্কের আরও কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রোগীকে উপযুক্ত জরুরি চিকিৎসাসুবিধাসম্পন্ন হাসপাতালে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

 

স্ট্রোক প্রধানত দুই ধরনের। ইস্কেমিক স্ট্রোকে মস্তিষ্কের রক্তনালি রক্তের জমাট বা অন্য কোনো কারণে বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে, হেমোরেজিক স্ট্রোকে রক্তনালি ফেটে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়। মস্তিষ্কের কোষ স্বাভাবিকভাবে কাজ করার জন্য অক্সিজেন ও পুষ্টিসমৃদ্ধ রক্তের ওপর নির্ভরশীল। রক্ত সরবরাহ ব্যাহত হলে মস্তিষ্কের কোষ দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দুই ধরনের স্ট্রোকের চিকিৎসাপদ্ধতি ভিন্ন। তাই জরুরি ভিত্তিতে ব্রেন সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়েছে কি না, তা নির্ণয় করা এবং দ্রুত উপযুক্ত চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।

 

থ্রম্বোলাইসিস: সময়মতো চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা

 

ইস্কেমিক স্ট্রোকের ক্ষেত্রে উপযুক্ত রোগীকে শিরার মাধ্যমে ওষুধ দিয়ে রক্তের জমাট গলিয়ে দেওয়ার চিকিৎসাকে ইন্ট্রাভেনাস থ্রম্বোলাইসিস (Intravenous Thrombolysis) বলা হয়। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন ও আমেরিকান স্ট্রোক অ্যাসোসিয়েশনের (AHA/ASA) ২০২৬ সালের নির্দেশিকা অনুযায়ী, উপযুক্ত প্রাপ্তবয়স্ক রোগীর ক্ষেত্রে লক্ষণ শুরুর প্রথম ৪.৫ ঘণ্টার মধ্যে alteplase অথবা tenecteplase দিয়ে চিকিৎসার সুপারিশ করা হয়েছে। চিকিৎসা যত দ্রুত শুরু করা যায়, ততই ভালো। উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ইমেজিং পরীক্ষার জন্য অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব না করে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা গুরুত্বপূর্ণ।

 

তবে ৪.৫ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেই সব চিকিৎসার সুযোগ শেষ হয়ে যায় না। উন্নত ইমেজিং পরীক্ষার মাধ্যমে মস্তিষ্কের এমন অংশ শনাক্ত করা গেলে, যেখানে রক্তপ্রবাহ পুনরুদ্ধার করলে উপকার পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, নির্বাচিত রোগীর ক্ষেত্রে লক্ষণ শুরুর ৪.৫ থেকে ৯ ঘণ্টার মধ্যে থ্রম্বোলাইসিস বিবেচনা করা যেতে পারে। ঘুম থেকে ওঠার পর স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দেওয়া কিছু রোগীর ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট ইমেজিং ও চিকিৎসাগত মানদণ্ড পূরণ হলে এই চিকিৎসার সুযোগ থাকতে পারে। তবে রোগীর উপযোগিতা ও চিকিৎসার সিদ্ধান্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নির্ধারণ করবেন।

 

থ্রম্বেকটমি ও অন্যান্য চিকিৎসা

 

মস্তিষ্কের বড় রক্তনালিতে রক্তের জমাট আটকে গেলে নির্বাচিত রোগীর ক্ষেত্রে মেকানিক্যাল থ্রম্বেকটমি (Mechanical Thrombectomy) পদ্ধতিতে বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে সেই জমাট অপসারণ করা যায়। উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে সাধারণত লক্ষণ শুরুর প্রথম ৬ ঘণ্টার মধ্যে এই চিকিৎসা দেওয়া হয়। নির্দিষ্ট চিকিৎসাগত ও ইমেজিং মানদণ্ড পূরণ করলে নির্বাচিত রোগীর ক্ষেত্রে ৬ থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেও থ্রম্বেকটমি করা সম্ভব।

 

হাসপাতালে পৌঁছাতে দেরি হলেও চিকিৎসার সুযোগ আছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, রক্তক্ষরণ বাড়াতে পারে এমন ওষুধের প্রভাব মোকাবিলা এবং প্রয়োজনে অস্ত্রোপচারসহ অন্যান্য চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।

 

স্ট্রোকের লক্ষণ চিনুন

 

হঠাৎ মুখ বেঁকে যাওয়া, শরীরের এক পাশ দুর্বল হয়ে পড়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া, কথা বুঝতে অসুবিধা, হঠাৎ দৃষ্টিতে সমস্যা কিংবা ভারসাম্য হারানো স্ট্রোকের লক্ষণ হতে পারে।

 

স্ট্রোকের লক্ষণ প্রথম কখন শুরু হয়েছে, অথবা রোগীকে শেষ কখন স্বাভাবিক অবস্থায় দেখা গেছে—সময়টি মনে রাখুন। চিকিৎসকদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।

 

লক্ষণ সাময়িকভাবে সেরে গেলেও অবহেলা করবেন না। এটি সাময়িক ইস্কেমিক অ্যাটাক (Transient Ischemic Attack বা TIA) হতে পারে, যা ভবিষ্যতে স্ট্রোকের ঝুঁকির একটি সতর্কসংকেত।

 

স্ট্রোকের সন্দেহ হলে কী করবেন?

 

* অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসাসেবা নিন এবং রোগীকে উপযুক্ত হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করুন।

* রোগীকে খাবার, পানি বা মুখে খাওয়ার ওষুধ দেবেন না, কারণ তাঁর গিলতে অসুবিধা থাকতে পারে।

* চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া রক্তচাপ কমানোর ওষুধ বা অ্যাসপিরিন দেবেন না। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হলে অ্যাসপিরিন পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক করে তুলতে পারে।

* রোগীর লক্ষণ কখন শুরু হয়েছে, তা লিখে রাখুন। ঘুম থেকে ওঠার পর লক্ষণ দেখা গেলে শেষ কখন স্বাভাবিক অবস্থায় ছিলেন, সেটিও জানান।

* রোগী অচেতন হয়ে গেলে বা শ্বাসপ্রশ্বাসে সমস্যা হলে অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসাসেবা নিন।

 

স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে যা করবেন

 

উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা, ধূমপান পরিহার, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, খাবারে অতিরিক্ত লবণ কমানো, শাকসবজি ও ফলমূলসহ সুষম খাবার গ্রহণ এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। পাশাপাশি চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী ওষুধ সেবন এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ।

 

স্ট্রোকের পর সুস্থ হতে পুনর্বাসন জরুরি

 

স্ট্রোকের পর অনেক রোগীর হাত-পা দুর্বল হয়ে যায়, কথা বলতে অসুবিধা হয় কিংবা হাঁটাচলা ও দৈনন্দিন কাজকর্মে অন্যের সাহায্যের প্রয়োজন হয়। এ অবস্থায় শুধু ওষুধই যথেষ্ট নয়; রোগীর অবস্থা ও প্রয়োজন অনুযায়ী পুনর্বাসনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

ফিজিওথেরাপি, কথা বলার অনুশীলন, গিলতে অসুবিধার চিকিৎসা এবং দৈনন্দিন কাজকর্মের সক্ষমতা ফিরিয়ে আনার প্রশিক্ষণের মাধ্যমে রোগীর স্বাধীনভাবে চলাফেরা ও জীবনযাপনের ক্ষমতা উন্নত করার চেষ্টা করা হয়। রোগীর অবস্থা স্থিতিশীল হলে চিকিৎসকের পরামর্শে উপযুক্ত পুনর্বাসন শুরু করা উচিত।

 

মনে রাখবেন

 

স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে অপেক্ষা নয়—অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসাসেবা নিন। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা মস্তিষ্কের ক্ষতি কমাতে, জীবন বাঁচাতে এবং দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতার ঝুঁকি হ্রাস করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

 

 

লেখক: ডা. সোমেন চৌধুরী

কনসালট্যান্ট ও কো-অর্ডিনেটর, নিউরোলজি বিভাগ

এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রাম